হক ফেরকা বনাম বাতিল ফেরকা

মুসলিম সমাজে একটি হাদীস প্রচলিত আছে, "মুসলিম উম্মত ৭৩টি দলে বিভক্ত হবে, যার মধ্যে একটি মাত্র দল জান্নাতী, আর বাদবাকি সবাই জাহান্নামী।" হাদীসটি কতটা সহীহ, আমি জানি না। তবে এ হাদীসটির দোহাই দিয়ে প্রত্যেকটা দল বা মাজহাবই নিজের দলকেই একমাত্র হক ফেরকা বলে প্রচার করছে, আর বাদবাকি সবাইকে একবাক্যে বাতিল ও বিপথগামী সাব্যস্ত করছে। হাস্যকর এই অসুস্থ প্রবণতাটি বিশেষ করে দুইটি দলের মধ্যে সবচাইতে বেশি পরিলক্ষিত হয়। এই দু'দলের মাঝে আবার সাপে নেউলে সম্পর্ক। একটি দলের কাছে অপর দলটি নির্ঘাত কাফের ও সকল ফেতনার মূল।
প্রথম দলটিকে বলি, যদি তোমার ফেরকাটাই একমাত্র সহীহ ফেরকা হয়ে থাকে, তাহলে—

  • তোমার ফেরকার অনুসারীরা জগতের সবচেয়ে ধিকৃত ব্যক্তি ইয়াজিদের গুণকীর্তন করে কেন? কেন তারা নবী দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-এর দোষ অন্বেষণ করে বেড়ায়? যে ফেরকাটি একমাত্র সত্য ফেরকা হবে, তারা অবশ্যই সব দিক দিয়ে সত্যবাদী হবে, এটাই তো হবার কথা! কিন্তু কারবালার ঘটনার বেলায় তারা জেনেশুনে মিথ্যাচার ও ধান্ধাবাজির পরিচয় দেয় কেন?
  • তোমার ফেরকার অনুসারী রাজা-বাদশাহরা ইসলাম ও মুসলমানদের চির দুশমন ইসরাইলের তাবেদারি করে কেন? কেনই বা ইসরাইলের প্রকাশ্য সহযোগী ইহুদীবাদী ও সেকুলার মিশরীয় সামরিক জান্তাকে মুসলিম গণহত্যার কাজে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করে?
  • তোমার ফেরকার অনুসারীরা কেন কোরআনের অপব্যাখ্যা করে ইসলামের নাম দিয়ে কোট-কাচারিতে জজ-ব্যারিস্টার ও নিরীহ বিচারপ্রার্থীদের হত্যা করছে এবং এটাকেই ইসলাম কায়েমের একমাত্র পন্থা বলে উদ্ভট দাবি করছে?

এবার দ্বিতীয় দলটিকে বলি, যদি তোমার ফেরকাটাই জগতের একমাত্র হক ফেরকা হয়ে থাকে, তাহলে—

  • তোমার ফেরকার অনুসারীরা কোরআনের বিকৃত অর্থ করে রসূল (সা.)-কে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করছে কেন? কেন তারা খ্রীস্টানদের ত্রিত্ববাদ ও মুশরিকদের অবতারবাদের অনুকরণে আল্লাহ ও রসূলকে একই সত্ত্বা বলে আখ্যায়িত করার মতন ভয়ঙ্কর শিরকী ও কুফরী আকীদা ধারণ ও প্রচার করে বেড়াচ্ছে?
  • তোমার ফেরকার অনুসারীরা মানুষকে সেজদা করা জায়েয মনে করে কেন?
  • তোমার ফেরকার অনুসারীরা খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রথম তিনজনের নামে গালিগালাজ ও অপপ্রচার চালায় কেন?
  • তোমার ফেরকার মানুষগুলো ধর্মবিরোধীদের সাথে সখ্য গড়ে ধর্মপ্রেমী মুসলিমদের সাথে দুশমনি করে কেন? কেন তারা একমুখে নবীপ্রেমিক দাবি করে, অপর মুখে নবীর দুশমনদের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে সত্যিকার নবীপ্রেমিক ও নবীর সম্মানের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ মানুষগুলোকে নাজেহাল করে?

একথা ঠিক যে, কোন ধর্ম বা মতবাদের অনুসারী কিছু ব্যক্তির অপকর্মের জন্য সেই ধর্ম বা মতবাদকে দায়ী করা যায় না। যেমন, কোন মুসলিমের ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা ও অন্যায় অপকর্মের জন্য ইসলামকে দায়ী করা যায় না। ইসলামকে বিচার করতে হয় ইসলামের মূল উৎস তথা কোরআন ও হাদীস দিয়ে, আল্লাহ ও রসূলের (সা.) কথা দিয়ে। কিন্তু কোন ফেরকা, দর্শন বা মতবাদের মূল প্রবক্তা, প্রচারক ও ধারক-বাহক এবং সেই সাথে প্রায় সকল অনুসারীগণ যদি কিছু কমন কথাবার্তা ও ধ্যান-ধারণা প্রচার করে, তখন সেটাকে উক্ত মতবাদের মূলনীতি হিসেবেই বিবেচনা করা চলে। যেহেতু দ্বীন এসেছে আল্লাহর তরফ থেকে এবং তা মানুষের মাঝে পরিচিত হয়েছে আল্লাহর রসূলের (সা.) মাধ্যমে, সেহেতু দ্বীনের শুদ্ধতা শুধু আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কথা দিয়েই বিচার করা যায়, আল্লাহর কোন সাধারণ বান্দা বা নবীর (সা.) কোন সাধারণ উম্মতের কথাবার্তা ও কৃতকর্ম দিয়ে দ্বীনকে বিচার করা যায় না। কিন্তু ফেরকা, মাযহাব বা উপদল যেহেতু মানুষের মনগড়া, সেহেতু কোন ফেরকা সহীহ বা ভ্রান্ত হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ফেরকার প্রবর্তক ও প্রচারকগণের ভূমিকা ও বক্তব্য দেখেই বিচার করা যায়। আর সত্যি বলতে কি, দ্বীনের মাঝে ফেরকাবাজি ও দলাদলি জিনিসটাই নিষিদ্ধ ও অনাকাঙ্ক্ষিত।

মুসলিম বিশ্বে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাবশালী মহল নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় এ দুটি গোষ্ঠীকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের ক্ষমতার লালসার শিকার হয়ে মুসলিম তরুণরা নিজেদের দুনিয়ার জীবন ও আখেরাতের জীবন নষ্ট করছে। মুসলিম যুব সমাজ দুটি ফেরকায় বিভক্ত হয়ে হানাহানি করে অপঘাতে মরলেও তাদের মাঝে বিভেদমূলক ধ্বংসাত্মক চিন্তার সঞ্চারকারী মহলদ্বয়ের রাজকীয় ভোগবিলাসে কোন কমতি হচ্ছে না। তারা কিন্তু নিজ নিজ রাজত্ব ও প্রভাব বলয়ের মধ্যে বহাল তবিয়তে সুরক্ষিত অবস্থায় আছে এবং ধর্মের নামে ভ্রান্ত আবেগ উষ্কে দিয়ে সাধারণ মুসলিম জনগণের সর্বনাশ করে নিজেদের রাজত্ব বিস্তারের নেশায় মেতে উঠেছে। এই দুটি মহলের মধ্যে একটি মহল ইহুদীবাদীদের সাথে এবং আরেকটি মহল নাস্তিকদের সাথে প্রকাশ্য ঐক্য গড়ে তুলেছে এবং তাদের নোংরা ক্ষমতালিপ্সা ও আধিপত্যবাদী নেশার ভিকটিম হচ্ছে শুধু মুসলিম উম্মাহ।

বর্তমান, নিকট অতীত ও দূর অতীত বিশ্লেষণ করে ইসলাম ও মুসলমানের কল্যাণে এ দুটি গোষ্ঠীর ইতিবাচক অবদান খুব কমই পাওয়া যায়। ইতিবাচক অবদান বলতে একটি গোষ্ঠীর দ্বারা আফগানিস্তানে রুশবিরোধী জিহাদ এবং অপর একটি গোষ্ঠীর দ্বারা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলী আধিপত্য মোকাবেলায় কিছুটা ভূমিকা পাওয়া যায়। কিন্তু সে তুলনায় তাদের নেতিবাচক ভূমিকার পাল্লাই অনেক ভারী বলে মনে হয়। মুসলমানদের যেকোন ক্রান্তিলগ্নে উল্লেখিত দুটি সম্প্রদায়কেই ইসলামের শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়ে মুসলমানদের পতন ঘটাতে একেবারে সময়মত এগিয়ে আসতে দেখা গেছে। হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ ধ্বংসে বাগদাদের শিয়া মন্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতা, টিপু সুলতানের সাহায্যার্থে আহমদ শাহ আবদালীর বংশধরের এগিয়ে আসতে চাইবার প্রাক্কালে ইরানের শাহের আফগানিস্তানে আগ্রাসন, আফগানিস্তানে রুশ ও মার্কিন আগ্রাসনকালে এবং ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনকালে আন্তরিক ও সক্রিয়ভাবে সহযোগিতার উদার হস্ত বাড়িয়ে দেয়া ইত্যাদি হলো তাদের একটি মহলের কীর্তি। অপর মহলটির কীর্তির মধ্যে রয়েছে ইরান-ইরাক যুদ্ধ বাধানো, ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ক্রুসেডারদেরকে মুসলিম ভূখণ্ডে নিয়ে এসে ঘাঁটি গাড়ানো, মিশরের মুরসীকে উৎখাত করে ইসলামবিরোধী ইহুদীবাদী সিসির জান্তাকে ক্ষমতায় নিয়ে আসা ও গণহত্যার মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হাজার হাজার কোটি ডলার দিয়ে সহায়তা করা, ইসরাইলের গাজা আগ্রাসনের সম্পূর্ণ খরচ বহন করা ইত্যাদি।

 

আলোচিত দুই অশুভ শক্তির খপ্পর থেকে আমাদের সন্তানদেরকে বাঁচাতে হলে নিম্নলিখিত সুপারিশমালা বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে:-

(১) খোলাফায়ে রাশেদীনের জীবনী ও চরিত্র শিক্ষা দিতে হবে। তাহলে তাঁদের নামে কেউ নেতিবাচক কথা বললেই তাদের আসল পরিচয় ধরতে পারবে। ফলে শিয়াবাদ বা বিকৃত সুফিবাদের প্রচারণা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

(২) কারবালায় ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগ ও ইয়াজিদের নিষ্ঠুরতার ইতিহাস অবহিত করতে হবে। তাহলে অন্তত এই একটি পয়েন্টে এসে সালাফীরা ধরা খাবে। নবী পরিবারের প্রতি অবজ্ঞা এবং নবী পরিবারের উপর হত্যাযজ্ঞ পরিচালনাকারী ব্যক্তির প্রতি সালাফিদের অনুরাগ দেখলেই আমাদের সন্তানেরা তাদের ভ্রান্তি ও মিথ্যাচার বুঝে যাবে এবং অন্য সকল ব্যাপারেও তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ধ্বংসের মাঝে নিপতিত হবার আশংকাটা কমে যাবে।

(৩) জরুরী প্রয়োজন (যেমন, হজ্জ-উমরা, চিকিৎসা বা চাকুরী ইত্যাদি) ছাড়া উক্ত দেশ দুটিতে ভ্রমণ করাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। বিশেষ করে লেখাপড়ার জন্য ঐ দেশগুলো মাড়ানো যাবে না। তাদের দূতাবাস ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো থেকেও সন্তানদেরকে যথাসম্ভব দূরে রাখতে পারলে উত্তম।

(৪) তাওহীদ ও রিসালাত সম্পর্কিত সঠিক আকীদা শিক্ষা দিতে হবে। আল্লাহ, নবী-রসূল, ফেরেশতা, সাহাবা, আউলিয়া সকলের সত্ত্বা ও মর্যাদা সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে হবে; যাতে এ ব্যাপারে কোন কমবেশি করা বা গোলমাল পাকিয়ে ফেলার চিন্তা ভবিষ্যতে সন্তানদের মনে প্রশ্রয় না পায়।

আপনার রেটিং: None

চমৎকার একটি লেখা, ধন্যবাদ আপনাকে।

-

==<>== ==<>== ==<>==

"আমার বিশ্বাসই আমার শক্তি।"

==<>== ==<>==

প্রত্যেক ফেরকার অনুসারীগণ নিজেদের অনুসৃত ফেরকাকে একমাত্র সহীহ ফেরকা বলে দাবি করলেও সবচাইতে চরম সত্য কথাটি হলো এই যে:- কোন ফেরকাই সহীহ নয়, ফেরকা মাত্রই গোমরাহী। ফেরকা হচ্ছে অনৈক্য ও বিভক্তিরই অপর নাম। ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জু তথা আল্লাহর বিধানকে আঁকড়ে থাকাই আল্লাহর নির্দেশ এবং বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দ্বীনের মধ্যে যেকোন প্রকার বিভ্রান্তি সৃষ্টি ও বাড়াবাড়িতে প্রবৃত্ত হওয়াটাও সর্বোতভাবে বর্জনীয়।

ফেরকাবাজি, অন্ধ আনুগত্য ও বেদাতফোবিয়া নিয়ে একটি কৌতুক

বিবদমান ফেরকা ও দল-গোষ্ঠীগুলো প্রত্যেকে নিজ নিজ নেতা, পীর, দল বা রাজপরিবারকে হকের মানদণ্ডরূপে গণ্য করে এবং কোরআন-হাদীসের রেফারেন্স দেবার চাইতেও নিজ গুরুদের রেফারেন্স প্রদানে অধিক উৎসাহী হয়ে থাকে। এদের একটি গোষ্ঠীর আকীদা-বিশ্বাস ও আমল শেরেক-বেদাতের উপরই প্রতিষ্ঠিত এবং শেরেকী ও বেদাতী কর্মকাণ্ডই তাদের ফেরকার মূল বৈশিষ্ট্য। আর অপর ফেরকাটি বেদাতফোবিয়ায় আক্রান্ত এবং তারা ঢালাওভাবে সবকিছুর মাঝেই শেরেক-বেদাত খুঁজে পায়। এক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত হাস্যকরভাবে সৌদী আরবে কি প্রচলিত আছে বা না আছে, সেটাকেই ধর্মের অকাট্য দলীল হিসেবে তুলে ধরে। তাদের যুক্তি হলো, নবী (সা.) যেহেতু মক্কা-মদীনায় থেকেছেন, ইসলাম যেহেতু প্রথম আরব উপদ্বীপে প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাই আজও উক্ত ভূখণ্ডে যা প্রচলিত থাকবে, তাই নবীর সুন্নত হিসেবে মানতে হবে। কিন্তু যুগের বিবর্তনে একটি ভূখণ্ডের শাসক ও জনগণের কালচার, চরিত্র ও কর্মকাণ্ডে যে ভালো-মন্দ পরিবর্তন হয়ে থাকা সম্ভব, এই বিষয়টা তাদের মাথায় ঢোকে না। নবীর ভূখণ্ডে যে নবীর দ্বীনে বিকৃতি বা পরিবর্তন অসম্ভব নয়, এটা তারা বোঝে না।
শেরেক-বেদাতের ব্যাপারে প্রয়োজনাতিরিক্ত সতর্কতা ও অনাবশ্যক খুঁতখুঁতেপনা এবং একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ও তার শাসনকারী রাজবংশকে সত্যের মানদণ্ডরূপে গণ্য করা সম্পর্কে একটা কৌতুক বর্ণনা করা যাকঃ-
সেলিম চাচার বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। গিয়ে দেখি, সেলিম চাচার বাড়িটিসহ আশপাশের বেশ কয়েক ডজন বাড়ি (বলতে গেলে গ্রামের প্রায় অর্ধেক বাড়ি) বেশ ভাঙ্গাচোরা, পথেঘাটে নোংরা আবর্জনা। আমরা তো দেখে বেশ অবাক হলাম। কারণ, সেলিম চাচার গ্রামটা তো বহু বছর আগে থেকেই উন্নত। বিশুদ্ধ পানি ও পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থাও বেশ ভালো ছিল। কিন্তু হঠাৎ এ কী দশা! সেলিম চাচার বাড়ি থেকে কয়েক কদম হেটে হাকিম আলী দোকানদারের কাছে জিজ্ঞেস করলাম, এর রহস্য কি? হাকিম আলী পুরো ইতিহাস তুলে ধরেন— আর বলবেন না ভাই! এসব কাহিনী নিয়ে হাসব না কাঁদব কিছুই ভাবতে পারছি না। সেলিম বাচার বাড়ি সহ পুরো গ্রামের অবস্থা বেশ ভালোই ছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটেছে সেলিম চাচা সৌদি থেকে ফেরার পর।
সেলিম চাচা লেখাপড়ার জন্য সৌদিতে গিয়ে পাঁচ বছর থাকার পর দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরেই তিনি তারস্বরে চেঁচামেচি শুরু করেন। "যত্তসব বেদাতী কারবার! নবীর দেশের সাথে আমাদের বাড়ির কোন মিল নেই। মক্কা-মদীনায় দেখে আসলাম মানুষ কমোডে প্রাকৃতিক কর্ম করে, আর আমার বাড়িতে যত্তসব পা-দানি ওয়ালা টয়লেট। এক্ষুণি সমস্ত টয়লেটে ভেঙ্গে দিয়ে সবগুলো বাথরুমে কমোড বসাও।" যেমন কথা তেমন কাজ। সেলিম চাচার বাড়ির টয়লেটগুলো ভেঙ্গে কমোড বসানোর কাজ চলছে। কিন্তু এই ভাঙ্গা-গড়ার সময়টাতে ওনারা কী করবেন? তাই যেখানে সেখানে প্রাকৃতিক কর্ম সারতেন। চাচার এই পাগলামিটা যদি শুধু নিজ বাড়িতেই সীমাবদ্ধ রাখতেন, তাহলেও কোন দু:খ ছিল না। কিন্তু তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে শাসিয়ে বেড়াচ্ছেন আর তার ভাষায় 'বেদাতী টয়লেট' বাদ দিয়ে সৌদী স্টাইলে কমোড বসাতে বাধ্য করছেন। ফলে সারা গাঁয়েরই এই অবস্থা- যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা। এমনকি গ্রামের মসজিদগুলো থেকেও প্রচলিত টয়লেট ভেঙ্গে দিয়ে কমোড বসানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছেন সৌদী ফেরত এই সেলিম চাচা।
সেলিম চাচার এই হাস্যকর অথচ দু:খজনক কীর্তিকলাপের কথা শুনে এবং উদ্ভট পাগলামি দেখে আর ওখানে বসে থাকতে মন চাইল না। এছাড়া পয়:নিষ্কাশনজনিত সমস্যার কারণে ওখানে আর আগের মতন শান্তিমত বেড়ানোর সুযোগও নেই। কয়েকদিন পর খবর পেলাম, সেলিম চাচী পঙ্গু হাসপাতালে। দেখতে গিয়ে যা শুনলাম, তাতে রাগে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেল। চাচার বাড়িতে কমোড বসানো সম্পন্ন হবার পর নতুন স্থাপিত কমোডের উদ্বোধন হয়েছিল চাচীকে দিয়ে। আর তখনই ঘটে বিপত্তি। কমোড থেকে পড়ে গিয়ে এই অবস্থা!Cry গ্রামের লোকজনও হাসপাতালে দেখতে এসেছেন চাচীকে। কেউ বলছেন, দ্বীনের পথে থাকতে গেলে, সহীহ তরীকায় চলতে গেলে, সুন্নত পালন করতে গেলে এক আধটু ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। চাচা ও চাচী নিশ্চয়ই এর উত্তম প্রতিদান পাবেন! আবার কেউ বলছেন, ধর্ম কত জটিল জিনিস, সুন্নত পালন কত ঝামেলার কাজ! এত ভোগান্তি করে ধর্মপালন করতে হবে কেন, সুন্নতের অনুসরণ করা লাগবে কেন? এবার মুখ খুললেন গ্রামের মুরুব্বী বয়োবৃদ্ধ হাকিম চাচা। তিনি বরাবরই উচিত কথা বলার মানুষ। তিনি বললেন, "এখানে আপনারা ধর্ম পালনের কী দেখলেন, আর সুন্নত অনুসরণেরই বা কী দেখলেন, যার জন্য ধর্মকে কঠিন মনে করতে হবে!" সেলিম চাচা ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, "কেন, নবীর দেশে কি আপনি কোন পা-দানি যুক্ত টয়লেট দেখেছেন? ওখানে কি কমোড ছাড়া আর কোন বাথরুম পেয়েছেন?" হাকিম চাচা জবাব দিলেন, "আরে বেক্কল! নবীর দেশে হলে কি হবে, নবীর যুগে কি এসব ছিল? নবীর সুন্নত হওয়া তো দূরের কথা, এটা তো মুসলমানদের কালচারের মধ্যেই ছিল না। এ জিনিসটা তো পুরোটাই পশ্চিমা খ্রিস্টানদের থেকে ধার করা, সম্পূর্ণ বিধর্মীদের অনুকরণে তৈরি, যা কিনা কথিত আধুনিকতার প্রতীক! আর তুই কিনা শুধু নবীর দেশে বলেই এটাকে নবীর সুন্নত বানিয়ে নিলি? নবীর সুন্নত তো সেটাই হবে, যেটা তিনি নিজে করেছেন বা তাঁর যুগে করা হয়েছে আর তিনি তাতে সম্মতি দিয়েছেন। তিনি বিদায় নেবার হাজার বছর পর তার দেশের মানুষ তো তাঁর সবকিছু আঁকড়ে নাও থাকতে পারে। আবার ভিন্ন কোন দেশের মানুষও নবীর সুন্নতের অনুসারী হয়ে থাকতে পারে। সুতরাং নবীর দেশে কি প্রচলিত আছে সেটা না দেখে নবী কি বলে গেছেন, আল্লাহর কোরআন ও নবীর হাদীসে কি আছে, সেটা দেখেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।" একজন প্রশ্ন করলেন, "তবে কি কমোড জিনিসটা হারাম ও বর্জনীয়? আর সৌদীদের সকল কর্মকাণ্ডই কি পরিত্যাজ্য?" হাকিম চাচার জবাব, "না বাবা, এমনটি নয়। মানুষের শারীরিক অবস্থা ও প্রাপ্যতা (availability) অনুসারে যে কেউ যেকোন পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, কোনটাই নিন্দনীয় বা অগ্রহণযোগ্য নয়। আর সৌদিদের সবকিছুই যে বর্জনীয় হবে তাও নয়। বরং তাদের যে কর্মকাণ্ডগুলো ইসলাম তথা কোরআন ও নবীর সুন্নতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে সেগুলো গ্রহণযোগ্য, আর যেগুলো অসঙ্গতিপূর্ণ হবে সেগুলো অগ্রহণযোগ্য। ঢালাওভাবে কারো অন্ধ আনুগত্য বা অন্ধ বিরোধিতা করা যাবে না এবং আল্লাহ ও রসূল ভিন্ন অন্য কাউকে হকের মাপকাঠিরূপে গণ্য করা যাবে না। আর যেকোন নতুন আবিষ্কৃত জিনিসের ক্ষেত্রে ইসলামের মৌলনীতি ঠিক রেখে কোরআন-হাদীসের দিকনির্দেশনার আলোকে জায়েয-নাজায়েয নির্ধারিত হবে। কেবল খামখেয়ালীবশত এটা হারাম ওটা হারাম জাতীয় ফতোয়াবাজি পরিহার করতে হবে।"
হাকিম চাচার জবাব শুনে প্রশ্নকারী বললেন, "তাই তো! সৌদিদের সকল কার্যই যদি সুন্নতমাফিক ও অনুসরণীয় হয়, তাহলে তো ইয়াজিদকে সমর্থন করা আর ইহুদী জালেমদের সহায়তা করাটাও জায়েয হয়ে যাবে, সিসির গণহত্যায় সাহায্য করাটাও পুণ্যের কাজ বলে বিবেচিত হবে। আবার পীর ধরা বা নেতা মানাকে জরুরী মনে করলে এবং পীর বা নেতার কথাকে অলংঘনীয় বলে বিশ্বাস করলে কোন কোন পীর কর্তৃক ধর্মবিদ্বেষীদের দালালী, প্রতারণা ও ধর্মব্যবসা ইত্যাদির সাথে সায় দিতে হয় এবং তাদের কথামতো রসূল (সা.)-কে আল্লাহর আসনে বসাতে হয়।"
সকল যুক্তিতর্ক শুনে সেলিম চাচা এবার দমে গেলেন। কিন্তু তিনি অপর একটি প্রশ্ন করলেন, "আমাদের তো সরাসরি নবীর হাদীসের প্রতি আমল করা উচিত, তাই নয় কি? তাহলে আমরা কেন ইমামদের অনুসরণ করব?" জবাবে হাকিম চাচা বলেন, "সহীহ হাদীসের দোহাই দিয়ে ইমামদের অনুসরণ করাটাতে যদি অসুবিধা feel করেন, তাহলে কোন একটা দেশ বা ভূখণ্ডের শাসক ও অধিবাসীদের অন্ধ অনুকরণ করাটা কিভাবে যুক্তিযুক্ত হতে পারে? এটা কি কোরআন ও সহীহ হাদীস অনুসরণের নীতির পরিপন্থী নয়?" এবার এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন, "তবে কি আমাদের কোরআন ও হাদীস অনুসরণের প্রয়োজন নেই, ইমামদের অনুসরণ করলেই চলবে?" হাকিম চাচা বললেন, "আমাদেরকে অবশ্যই কোরআন ও সহীহ হাদীসই অনুসরণ করতে হবে। আর কোরআন-হাদীস বোঝার সুবিধার্থে সম্মানিত ইমাম ও ফকীহগণ সহ যেকোন আলেমের সহায়তা আমরা নিতে পারি, তবে তা অবশ্যই কোরআন ও হাদীসের সাথে যাচাই সাপেক্ষে।"

Rate This

আপনার রেটিং: None